হারিয়ে যাওয়া পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছেন ড. ফোরকান সরকার

বাংলাদেশের এক ঐতিহ্যবাহী আঁশের নাম “পাট”। এক সময় এই আঁশকে বলা হতো সোনালি আঁশ বা গোল্ডেন ফাইবার । প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উপাদান ছিল এই পাটের আঁশ । বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জমির উর্বরতা এই ধরনের আঁশ উৎপাদনের জন্য উৎকৃষ্ট বলা চলে। বাংলাদেশে এতো সহজে অনেক ভালো গুনাগুণ সম্পন্ন পাট উৎপাদন হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাব, মন্দা বাজার অবস্থা ও অনেকটা অবহেলার কারনে এক প্রকার হারিয়েই যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী পাট। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রাম-বাংলার কৃষক শ্রেণি এবং দেশ। জাতীয় অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল এই আঁশের। তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

Jute fibre composite
Dr Forkan Sarkar: United Nations Fellow and Commonwealth Scholar


অথচ আগের তুলনায় পাটের চাহিদা এখন বেড়েছে বহুগুনে। আগে যদিও শুধুমাত্র পাটের আঁশ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হত
, অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য পাটের আঁশই ছিল  এন্ড প্রোডাক্ট। বর্তমানে নানা ধরনের পণ্য তৈরিতে অন্যান্য আঁশের তুলনায় পাটের আঁশই বেশি চাহিদা সম্পন্ন। পাট আঁশ বিশেষ করে এদের সুলভ, সস্তা ও পরিবেশ বান্ধব বৈশিষ্টের জন্য বর্তমানে প্রায় সকল ধরনের ব্যবহারে অন্যান্য দামি আঁশের যোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নানান ধরনের ফ্যাশন আইটেম, জিও-টেক্সটাইল, এবং হস্তশিল্প যেমনঃ হাত ব্যাগ, মানিব্যাগ, স্কুল ব্যাগ, জুতা, শপিং ব্যাগ, বস্তা, নিয়মিত বাজারের ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে পাটের আঁশ ব্যবহার করে। বৈশ্বিক পরিবেশ দূষণের এই সময়ে সবাই বিশেষ করে গার্মেন্ট বায়ার পরিবেশ বিষয়ে বেশ সচেতন। তাই তারা কোন অর্ডার দেয়ার সময় পরিবেশ বান্ধব উপাদানের উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।

Jute fibre biocomposite
Jute fibre reinforced bio-composites for structural applications

তাছাড়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পাটের আঁশ এখন আর শুধুমাত্র টেক্সটাইল আঁশ কিংবা টেক্সটাইল আইটেম তৈরিতেই ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং এই আঁশের ব্যবহার এখন অনেক বিস্তৃত। পাট আঁশের বিশেষ বৈশিষ্টের জন্য তা বর্তমানে নানান ধরনের হাই পারফরম্যন্স এপলিকেশনে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এসব হাই পারফরম্যান্স এপলিকেশনে পাটের ব্যবহার এখনো গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে, তবে ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী গবেষকরা অন্যান্য দামি ও সিনথেটিক ফাইবারের বিকল্প হিসেবে এই আঁশের সমূহ সম্ভাবনা উম্মোচন করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের তরুন গবেষক ড. ফোরকান সরকার তার গবেষণার মাধ্যমে অটোমোবাইল এবং এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিতেও পাটের ব্যবহার সম্ভব বলে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। উল্লেখ্য যে, তিনি কমনওয়েলথ স্কোলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোম্পজিট ম্যাটারিয়ালের উপর পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পাটের উপর গবেষণা থেকে ইতিমধ্যেই তিনি ৪ টি গবেষণা পেপার Q1 জার্নালে প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া তিনি ইউনিডো প্রজেক্ট ফান্ডে বোল্টন বিশ্ববিদ্যালয়, ইংল্যান্ড থেকে এমএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

ড. সরকারের উদ্ভাবিত কৌশলের মাধ্যমে পাট আঁশ এখন উচ্চ শক্তি সম্পন্ন কম্পোজিট পণ্য তৈরিতে গ্লাস ফাইবারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই তার গবেষণা দল পাট আঁশের কম্পোজিট দিয়ে গাড়ির দরজা, থার্মাল রেসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিন কভার বা বনেট, হাই ডেমেজ টলার‍্যান্স পাইপ, সেইফটি হেল্মেট, এবং অধিকতর শক্তিসম্পন্ন টেউটিন সফল্ভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তার গবেষণার উদ্ভাবিত কৌশলের উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সহজেই ব্যবহারযোগ্যাতা। একজন কৃষক এই কৌশলটি ব্যবহার করে বাসায় বসে নিজের হাতে স্বল্প বিনিয়োগে পাটের নতুন আর্কিটেকচার বা রূপ দিতে পারবেন, যা বিভিন্ন ধরনের কম্পোজিট তৈরিতে ব্যবহৃত হবে। এতে করে পাট চাষিরা বর্তমানে যে দামে র-আশ (raw fibre) বিক্রি করে, তার থেকে ন্যুনতম ৫-১০গুন বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন। এতে করে কৃষক ভাইরা আবারও পাট চাষে মনোনিবেশ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে এক সময়ের গোল্ডেন ফাইবার “পাট”। এতে করে কৃষক ভাইরা যেমনি উপকৃত হবেন, ঠিক তেমনি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেও অবদান রাখতে পারবে বহুগুণে।  তাছাড়া দেশের অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিও উৎসাহিত হবে।

You may also like:

4 Comments

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  3. যারা জুট কম্পোজিট নিয়ে বেশী আগ্রহী এবং যারা jute sector এর সাথে জড়িত তাদের উদ্দেশ্যে বলছি। যদি সরাসরি জুট ফাইবার কে কম্পোজিটে রুপান্তরিত করা হয় তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাচা পাটের দাম বেড়ে যাবে । এতে কৃষকরা লাভবান হলেও তখন রপ্তানির কারনে দেশের পাটকল গুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে হাজার হাজার লোক বেকার হয়ে যাবে। তবে আমি জোরালো ভাবে বিশ্বাস করি পাটের কাপড়ের কম্পোজিট শুধু ফাইবার কম্পোজিট থেকে অনেক শক্তিশালী এবং ভালো গুণাবলির। তাই বিলম্ব না করে বুটেক্স এবং বুয়েট যৌথ ভাবে জুট ফ্যব্রিক কম্পোজিট নিয়ে রিসার্চ করে পারফর্মেন্স অপটিমাইজেশন ও বানিজ্যিকি করনে ভুমিকা রাখতে পারে। বুয়েটের জুট কম্পোজিট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি তাদের এ সংক্রান্ত একটা PhD থিসিসের সাথে জড়িত ছিলাম। জুট ফ্যব্রিক কম্পোজিটের দাম কিছু টা বেশী হলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে অনেকটা monopoly business করতে পারবে। কারন যারা ফাইবার কম্পোজিট বানাবে তারাও অনেক দামেই বিক্রি করবে। তাই জুট ফ্যব্রিক কম্পোজিটই গোল্ডেন কম্পোজিটে পরিনত হবে। Being a TE we must not celebrate this victory of other academic disciplines while lots of jobs of TE and poor people working in the jute mills will be at stake. There is no value addition from TE point of view. So I think we must be smart enough to at least understand the which is good and which is bad for us. Forkan is our next generation expert researcher from Manchester University where I also did my PhD so while I am writing this note this is also hurting me as I may hurt one of my younger BUTEXIAN, MANCUNIAN and a very successful and smart researcher. I have already shared my view with him about this. My point is not about the invention but about the professional excellence. If we can convert woven jute composite then the benefits are lot more e.g., i) amount harmful matrix will decrease a lot, ii) much better composite, in respect of mechanical properties point of view, will be produced. iii) activities on the basis of woven jute composites will open a new avenue of jute spinning and weaving; like recharging an old battery and bringing it back to work iv) the overall weight of jute composite will be less than that of fibre composite leading less fuel consumption. v) the dignity of textile engineering and textile engineers will be established to a great extent than what it is now and much more will added after a PhD research is being completed.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thank you sir for your experienced opinion. We would like to invite you to contribute some technical articles to Texpedi.com which is one of most popular textile learning platforms for the textile engineering students, academicians as well as practitioners.

      Delete

Post a Comment

Previous Post Next Post